
ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগে উচ্চমান হিসাব সহকারী পদে কর্মরত জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে চাকরির আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘুষ, কমিশন বাণিজ্য, বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা ও বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে তিনি প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদার ও স্থানীয় বাসিন্দা।
জাহাঙ্গীর আলম বর্তমানে ১৪তম গ্রেডের উচ্চমান হিসাব সহকারী হিসেবে কর্মরত। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন একই দপ্তরে দায়িত্ব পালনের সুযোগে তিনি গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে একটি কথিত কমিশন সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের অভিযোগ, গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন কাজের বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীর আলমকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়। এ ছাড়া প্রাক্কলন তৈরি, ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন লাইসেন্স ইস্যুসহ বিভিন্ন কার্যক্রমেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, নির্ধারিত কমিশন বা অতিরিক্ত অর্থ দিতে কেউ অস্বীকৃতি জানালে তার ফাইল আটকে রেখে হয়রানি করা হয়।
এ ছাড়া ই-জিপি চালুর আগের সময়ের সিডিউল ফি, লাইসেন্স নবায়ন ফি এবং সরকারি রাজস্বের কয়েক লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পাশাপাশি বিভিন্ন লাইসেন্স ব্যবহার করে বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নসংলগ্ন এলাকায় জাহাঙ্গীর আলমের একটি চারতলা বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বাড়িটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা।
স্থানীয়দের আরও দাবি, কামারখালী এলাকায় নিজের ও স্ত্রীর নামে বিভিন্ন স্থানে জমি কিনেছেন জাহাঙ্গীর আলম। তবে এসব জমির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ও মালিকানা সংক্রান্ত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া ফরিদপুর শহরের ডিআইবি বটতলা এলাকার একটি ১০ তলা ভবনে তাঁর একটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই ফ্ল্যাটের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা।
অভিযোগকারীরা বলছেন, দীর্ঘ প্রায় ২০ বছরের চাকরিজীবনে জাহাঙ্গীর আলমের সরকারি বেতন ও ভাতা থেকে যে আয় হওয়ার কথা, তার তুলনায় তাঁর দৃশ্যমান সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি।
তাদের প্রশ্ন, সরকারি চাকরির আয় দিয়ে কীভাবে অল্প সময়ে এত বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে তাঁর সম্পদ ও আয়ের উৎস তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদারের দাবি, দীর্ঘদিন ক্যাশিয়ার ও হিসাবসংক্রান্ত দায়িত্বে থাকার কারণে জাহাঙ্গীর আলম গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।
এক ঠিকাদারের ভাষ্য, ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজের বিল, লাইসেন্স এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা করা হয়। কেউ এতে সহযোগিতা না করলে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ তাঁর।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা স্বাধীন তদন্তের ফলাফল প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য জানার জন্যও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত এবং জাহাঙ্গীর আলমের আয়-ব্যয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পদের তুলনামূলক যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
মন্তব্য করুন