উন্নয়নকাজের উদ্বোধন, অতিথিদের উপস্থিতি, মিষ্টি বিতরণ—সবকিছুই ছিল পরিকল্পনার অংশ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে রাস্তা পাকাকরণের ঘোষণা দিয়ে পরদিন থেকেই পুরোনো ইট খুলে নিয়ে যায় একটি প্রতারক চক্র। কয়েক দিনের মধ্যেই সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ইটের রাস্তা পরিণত হয় কাঁচা মাটির সড়কে।
চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা ঘটেছে জামালপুর সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের গজারিআটা গ্রামে।
উদ্বোধন, জিলাপি বিতরণ—তারপরই শুরু ইট অপসারণ
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ১২ মে ভাঙ্গুরিঘাট থেকে ময়নার মোড় পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়ক পাকাকরণের নামে একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটি নির্মাণ করবে ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় ঠিকাদার হিসেবে কাজ করবেন আবদুল মান্নান।
অনুষ্ঠানের একপ্রান্তে উপস্থিত ছিলেন জামালপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সহসভাপতি ও সম্ভাব্য ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী অ্যাডভোকেট তাপস। অন্যপ্রান্তে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। অনুষ্ঠানে প্রায় ২০ কেজি জিলাপি বিতরণ করে উন্নয়নকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
পরদিন থেকেই কথিত ঠিকাদারের লোকজন রাস্তার পুরোনো ইট খুলে ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনে করে অন্যত্র সরিয়ে নিতে শুরু করে।
ইট গেল, রাস্তা আর পাকা হলো না
স্থানীয় ভ্যানচালক আনিসুর রহমান বলেন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখে এলাকাবাসী বিশ্বাস করেছিলেন, দ্রুতই পাকা রাস্তার কাজ শুরু হবে। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে পুরো রাস্তার ইট তুলে নেওয়া হলেও নতুন নির্মাণকাজ আর শুরু হয়নি। ফলে বর্ষায় কাঁচা সড়কে চলাচল এখন অত্যন্ত দুর্ভোগের হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা হোসেন আলীর অভিযোগ, রাস্তার ইট আশপাশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হয়েছে। কেউ প্রশ্ন তুললে কথিত ঠিকাদার ও তার লোকজন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাতেন।
দ্বিতীয়বার একই কৌশল, এলাকাবাসীর হাতে ধরা ১১ সদস্য
প্রথম ঘটনার এক মাসেরও কম সময় পর একই চক্র সদর উপজেলার চাঁদপুর এলাকার আরেকটি সড়কের ইট খুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। আগের মতো সেখানেও উন্নয়নকাজের উদ্বোধনের আয়োজন করা হয়।
তবে গজারিআটার ঘটনার কারণে সতর্ক স্থানীয়রা এবার প্রকল্পের কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র ও সরকারি অনুমোদনের কাগজপত্র দেখতে চান। বৈধ কোনো নথি দেখাতে না পারায় ক্ষুব্ধ জনতা চক্রের ১১ সদস্যকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
মূল হোতা পরিচয় দিয়েছিলেন ঠিকাদার হিসেবে
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রতারক চক্রের মূল হোতা আবদুল মান্নান (৫০) জামালপুর সদর উপজেলার দিগপাইত ইউনিয়নের হবদেশ গ্রামের বাসিন্দা। দীর্ঘদিন ঢাকায় থাকার পর এলাকায় ফিরে নিজেকে ঠিকাদার হিসেবে পরিচয় দেন।
পরে তদন্তে জানা যায়, তিনি প্রকৃতপক্ষে কোনো সরকারি ঠিকাদার নন। গ্রেপ্তারের পর তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
এমপি ও আইনজীবীর বক্তব্য
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য শাহ মো. ওয়ারেছ আলী (মামুন) বলেন, স্থানীয়দের অনুরোধে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তখন তিনি বিষয়টি প্রতারণা বলে বুঝতে পারেননি।
অন্যদিকে অ্যাডভোকেট তাপস বলেন, তিনি স্থানীয় এক সাংবাদিকের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের খবর পেয়েছিলেন। তিনি স্বীকার করেন যে জিলাপি বিতরণ করা হয়েছিল, তবে সেটি রাস্তার কাজ নয়, একটি সেতুর কাজ উপলক্ষে ছিল বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক উল্লেখ করে দ্রুত সমস্যার সমাধানের আহ্বান জানান।
এলজিইডি বলছে, কোনো দরপত্রই হয়নি
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী আকরাম হোসেন তালুকদার জানান, ওই সড়কের উন্নয়নকাজের জন্য কোনো দরপত্রই আহ্বান করা হয়নি। ফলে কথিত ঠিকাদারের কাজ করার প্রশ্নই ওঠে না।
তিনি বলেন, রাস্তার ইট তুলে নেওয়ায় স্থানীয় মানুষের চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মন্তব্য করুন