মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৫:৪৩ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ধরা পড়তেই ৬৮ হাজার টাকা ফেরত

সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ধরা পড়তেই ৬৮ হাজার টাকা ফেরত

সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর মানিকগঞ্জের সিংগাইর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা ইরানি আক্তার ৬৮ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পৌরসভার রাজস্ব কোষাগারে ওই টাকা জমা দেওয়ার পর তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। তিন কার্যদিবসের মধ্যে তাকে জবাব দিতে বলা হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এর আগেও ইরানি আক্তারের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। সে সময়ও অর্থ ফেরত নিয়ে শুধু শোকজের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিল বলে জানা গেছে।

জরিপের বিলেই ৬৮ হাজার টাকার গরমিল

সিংগাইর পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে নতুন স্থাপনার তালিকা তৈরি এবং বার্ষিক হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণের জন্য জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

প্রায় এক মাস ধরে এ কাজে পৌরসভার ২০ থেকে ২২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মাঠে দায়িত্ব পালন করেন। প্রত্যেকের জন্য দৈনিক ৫০০ টাকা করে ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে, জরিপকাজের বিল প্রস্তুত ও অনুমোদনের সময় অতিরিক্ত ৬৮ হাজার টাকার বিল সংযুক্ত করা হয়। এ কাজে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ইরানি আক্তার কর নির্ধারক মো. সোলাইমান সিদ্দিকীর ওপর চাপ প্রয়োগ করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

পরে বিষয়টি পৌর প্রশাসকের নজরে আসে। প্রাথমিকভাবে হিসাব যাচাই করে বিলের গরমিল ধরা পড়ার পর সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।

পৌর প্রশাসকের নির্দেশে গত ৪ আগস্ট অতিরিক্ত ৬৮ হাজার টাকা পৌরসভার রাজস্ব কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।

টাকা ভাগাভাগির অভিযোগ

অভিযোগ সংশ্লিষ্ট একটি নথিতে ৬৮ হাজার টাকা ভাগাভাগির তথ্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সেখানে ইরানি আক্তারের নামে ৫৫ হাজার টাকা, সাবেক হিসাবরক্ষক আনিসের নামে ৫ হাজার টাকা এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষক মুকুলের নামে ৮ হাজার ৩০০ টাকা উল্লেখ রয়েছে।

তবে এ টাকা গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।

সাবেক হিসাবরক্ষক আনিসুর রহমান জানান, বিল পাস হওয়ার আগেই তিনি বদলি হয়ে গিয়েছিলেন। তার ভাষ্য, সোলাইমান তাকে ৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। তিনি টাকা নিতে চাননি বলেও দাবি করেন।

বর্তমান ভারপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষক মুকুল বলেন, ৮ হাজার ৩০০ টাকা নেওয়ার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তার নাম ব্যবহার করে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, সেটিও তিনি জানতেন না বলে দাবি করেন।

‘বিষয়টি প্রশাসক জানার পর টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে’

পৌরসভার কর নির্ধারক মো. সোলাইমান সিদ্দিকীর দাবি, অতিরিক্ত ৬৮ হাজার টাকা নেওয়ার বিষয়টি তিনি জানতে পেরে পৌর প্রশাসককে জানান।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসক হিসাব যাচাই করে গরমিল পান এবং টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে ওই অর্থ পৌরসভার কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।

সোলাইমান আরও অভিযোগ করেন, অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়ে তাকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও রেজিস্টারের কপিও তার কাছে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

আগেও ১ লাখ ১০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

সিংগাইর পৌরসভায় ইরানি আক্তারের বিরুদ্ধে এর আগেও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল বলে জানা গেছে।

২০২৫ সালে চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট বিনামূল্যে দেওয়ার কথা থাকলেও প্রতিটির জন্য ৫০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এভাবে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ একপর্যায়ে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

পরে বিষয়টি জানাজানি হলে তৎকালীন পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান ওই অর্থ পৌরসভার রাজস্ব কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং ইরানি আক্তারকে শোকজ করা হয়।

তবে অভিযোগের বিষয়ে তখনও বড় ধরনের কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

‘টাকা নিয়েছি, কীভাবে নিয়েছি—আমার কাছে প্রমাণ আছে’

অভিযোগের বিষয়ে ইরানি আক্তারের বক্তব্য জানতে পৌরসভায় গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরাসরি অভিযোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়ে অফিসে গিয়ে কথা বলার কথা জানান।

৬৮ হাজার টাকা নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তিনি কীভাবে টাকা নিয়েছেন, তার কাছে সে বিষয়ে প্রমাণ রয়েছে এবং চেক কখনো তার নামে হয় না। এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।

প্রশাসনের বক্তব্য

সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক খায়রুন্নাহার পপি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রম পরিদর্শনের সময় লেবার বিলের অসংগতি তার নজরে আসে। পরে বিষয়টি যাচাই করে ৬৮ হাজার টাকার গরমিল পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মাস্টার রোল দেখিয়ে ওই টাকা উত্তোলন করেছিলেন। তাকে টাকা কোষাগারে জমা দিতে বলা হলে তিনি তা জমা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তাকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে জবাব দেওয়ার জন্য শোকজ করা হয়েছে।

ইউএনও আরও জানান, জবাব পাওয়ার পর বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হবে এবং কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নিতে পারে।

শুধু টাকা ফেরত দিলেই কি শেষ দায়?

সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, সরকারি অর্থের হিসাবে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর শুধু টাকা ফেরত ও শোকজের মধ্যেই যদি বিষয়টি শেষ হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম ঠেকানো কতটা সম্ভব?

তাদের মতে, অভিযোগের প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের হিসাব-নিকাশে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এখন শোকজের জবাবে ইরানি আক্তার কী ব্যাখ্যা দেন এবং তার বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক বা আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, সেটিই দেখার বিষয়।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে এখন এনসিপিতে যোগদানের অভিযোগ

ধানমন্ডি ৩২ থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সন্দেহে আটক ১

১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় ডেল্টা লাইফের সাবেক সিএফও কারাগারে

সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ধরা পড়তেই ৬৮ হাজার টাকা ফেরত

ফ্যামিলি কার্ডের শুমারিতে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে ইউএনও কার্যালয় ভাঙচুর

এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

২২০ কোটি খরচে মানুষ থেকে কুকুর, সামনে এল আসল ঘটনা!

গোয়াইনঘাটে বিএনপি নেতা স্বপন-মান্নানের থাবায় তছনছ পিয়াইন নদী

আত্রাইয়ে মাদক সেবনের ছবি ফেসবুকে পোস্ট, মাদকসেবীর ২ মাসের কারাদণ্ড

গ্যাস সংকটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সব ফিলিং স্টেশন বন্ধ

১০

মিরপুরে পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তার ২৫

১১

চট্টগ্রামে অগ্রণী ব্যাংকের ভল্ট থেকে গায়েব ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা

১২

স্বামীর বিরুদ্ধে মিথ্যা যৌতুক মামলা করায় স্ত্রীর কারাদণ্ড

১৩

তানজিদের অনবদ্য ব্যাটিংয়ে মুগ্ধ অজি কিংবদন্তিরা

১৪

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দেশে ফিরলেন নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

১৫

শাবিপ্রবিতে ‘বিকৃত কায়দায়’ র‌্যাগিং, তদন্তে কমিটি গঠন

১৬

মন্ত্রিপরিষদে যুক্ত হচ্ছে নতুন ৪ নাম, আলোচনায় যারা

১৭

পায়ে স্কচটেপ দিয়ে পেঁচানো ছিল ৩ হাজার ৯৩৫ ইয়াবা, আটক ২পায়ে স্কচটেপ দিয়ে পেঁচানো ছিল ৩ হাজার ৯৩৫ ইয়াবা, আটক ২

১৮

বাড়ির সীমানা নিয়ে দ্বন্দ্ব, গৃহবধূকে হ/ত্যা/র অভিযোগে দেবরসহ গ্রেপ্তার ৩

১৯

এসএসসিতে শতভাগ ফেল, ৩১২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে

২০