স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রভাব খাটিয়ে প্রকল্প ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণ এবং বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময়ে এলজিইডির গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে তিনি শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন।
বর্তমানে তিনি এলজিইডির সড়ক ও সেতু রক্ষণাবেক্ষণ ইউনিটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি পরিকল্পনা, ডিজাইন ও গবেষণা ইউনিটের অতিরিক্ত দায়িত্বেও রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। বড় অঙ্কের অর্থায়নের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের অধিকাংশই অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যনির্ভর। অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জাবেদ করিমের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী তাজুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে প্রভাব বিস্তার করেন জাবেদ করিম। মন্ত্রীর তৎকালীন ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস) জাহিদ হোসেন চৌধুরীর সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
ওই সময় এলজিইডির বড় অঙ্কের অর্থায়নের একাধিক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে এলজিইডির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার প্রভাব ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৭ বছরে জাবেদ করিম ১০টিরও বেশি বড় অর্থায়নের প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন। এর মধ্যে RIVER CRIM বহুমুখী দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, জরুরি ভিত্তিতে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় মাল্টি-সেক্টর প্রকল্প এবং MDSP উল্লেখযোগ্য।
অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপিতে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি নির্ধারণ করা হতো। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও পাওয়া যেত বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
উদাহরণ হিসেবে একটি সোলার লাইটের কথা উল্লেখ করে অভিযোগে বলা হয়েছে, বাজারে যার দাম ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা, কোনো কোনো প্রকল্পে সেটির মূল্য প্রায় ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে এসব মূল্য নির্ধারণ ও প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথিপত্র বা স্বাধীন তদন্তের ফলাফল প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন মন্ত্রীর এপিএসের সহযোগিতায় পছন্দের কর্মকর্তাদের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতেন জাবেদ করিম।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের আকার অনুযায়ী একজন কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এর আগে মুন্সীগঞ্জ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রতিটি বিলের বিপরীতে ২ শতাংশ করে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া নির্মাণকাজের টেস্ট রিপোর্ট করানো, বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ এবং সদর দপ্তর থেকে ফান্ড ছাড় করানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই সময় তার বিরুদ্ধে ১ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৯ টাকার একটি অডিট আপত্তিও ছিল।
জাবেদ করিম ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বিপুল সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে রাজধানীর গুলশান-১ এলাকায় প্রায় ৩০ কাঠা জমির ওপর একটি বড় গ্যারেজের কথা বলা হয়েছে। এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া বনানীর ২৫/এ সড়কের একটি বাড়ির বাজারমূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা, প্রগতি সরণির শহীদ আব্দুল আজিজ রোডের ৩০ কাঠার একটি প্লটের মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই স্থাপনার একটি অংশ ‘পেইন টেকিং অটোমোবাইলস’ নামে গ্যারেজ হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পূর্বাচলে প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যে একটি প্লট তার ছোট স্ত্রীর নামে কেনা হয়েছে। গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকায় প্রায় ১৫ কোটি টাকার একটি বাড়ি, উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরে প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের ৩ হাজার ২০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট এবং আফতাবনগরে প্রায় ১২ কোটি টাকা মূল্যের একটি প্লট রয়েছে।
এ ছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় প্রায় ৪০ কোটি টাকা মূল্যের একটি প্লট, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় প্রায় ৭ কোটি টাকার বাড়ি, কেরানীগঞ্জে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার সম্পত্তি, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীতে প্রায় ৫ কোটি টাকার প্লট এবং ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পে প্রায় ২ কোটি টাকার প্লট থাকার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে বলা সম্পদগুলোর মোট মূল্য ও মালিকানা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জাবেদ করিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে এসব অভিযোগের কার্যকর তদন্ত হয়নি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে অভিযোগের পরও তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে দুদকের কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জাবেদ করিমের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
মন্তব্য করুন