টানা আট দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও একের পর এক পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলার জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও লাখো মানুষ এখনও পানিবন্দি। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু-কালভার্ট, কৃষিজমি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো। দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার তীব্র সংকট।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই পাঁচ জেলায় এখন পর্যন্ত ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ৩৯ জন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা পৌঁছেছে প্রায় ৮ লাখ ৬৭ হাজারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম জেলা, যেখানে প্রায় ৬ লাখ ৬২ হাজার মানুষ বন্যার কবলে পড়েছেন।
সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি
দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশে বন্যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। সাতকানিয়ার প্রায় সব ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা সদর এলাকায় পানি কিছুটা কমলেও বাজালিয়া ইউনিয়নসহ কয়েকটি এলাকায় এখনো পানি বাড়ছে। সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে থাকায় অনেক সড়ক ডুবে রয়েছে এবং বান্দরবানের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল।
বাঁশখালী উপজেলার চাম্বল, ছনুয়া, সরল, পুঁইছড়ি, বাহারছড়া, বৈলছড়ি, গণ্ডামারা ও শেখেরখীল ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে। হাজার হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাঁচ জেলায় ১ হাজার ৭২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন মানুষ। শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন প্রায় ২২ হাজার ৬০০ জন।
আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা অনেকেই খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সংকটের অভিযোগ করছেন। শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।
কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি
টানা বৃষ্টি ও বন্যায় কৃষি খাতে নেমে এসেছে বড় ধরনের বিপর্যয়। পাঁচ জেলায় প্রায় ১৮ হাজার ৯৩৩ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি, পান বরজ, আদা ও হলুদের।
কৃষকদের দাবি, বছরের একমাত্র সম্বল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপর্যয়
বন্যার পানিতে চট্টগ্রাম জেলার ৫১৪টি সড়ক এবং ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাঁচ জেলার সম্মিলিত হিসাবে প্রায় ২৪১ কিলোমিটার জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা সড়কের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব অবকাঠামো সংস্কারে কয়েকশ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে পাঁচ দিন বন্ধ থাকার পর রেললাইন থেকে পানি নেমে যাওয়ায় আবার চালু হয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ, এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ কিছুটা কমেছে।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার
বন্যাদুর্গত এলাকায় সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৯১ দশমিক ৬ মেট্রিক টন চাল, ৯১ লাখ টাকার বেশি নগদ সহায়তা এবং ৩৪ হাজার ৪৭০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিশু খাদ্য, ডায়াপার, স্যানিটারি ন্যাপকিনসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রীও দেওয়া হচ্ছে।
আরও ভারী বৃষ্টির শঙ্কা
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আবারও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে নদ-নদীর পানি ধীরে নামলেও নতুন করে জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।
প্রশাসন দুর্গত এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
পুনর্বাসন এখন বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, পানি কমতে শুরু করলেও দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে আসতে সময় লাগবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, কৃষি উৎপাদন পুনরুদ্ধার, সড়ক যোগাযোগ সচল করা এবং বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
মন্তব্য করুন