ইরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের যে কৌশল অতীতে সফল হয়নি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও সেই পথেই হাঁটছেন বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিমান হামলা ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ালেও তেহরানকে একতরফাভাবে আলোচনার টেবিলে আনতে পারবে—এমন ধারণার পক্ষে বাস্তবভিত্তিক কোনো প্রমাণ নেই।
রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে টানা সাড়ে চার মাসের সংঘাত নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি ভেঙে যাওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এতে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও বিশ্ব অর্থনীতিও নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের পথও ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
চলতি সপ্তাহে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে।
অন্যদিকে তেহরান সতর্ক করে জানিয়েছে, এমন হামলা হলে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর মাধ্যমে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত করা হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা, সেতু এবং ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে। এমনকি ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের মতো সামরিক বিকল্পও আলোচনায় রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
সংঘাতের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন এবং দেশটির প্রতিরক্ষা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু এতকিছুর পরও তেহরানের নীতিগত অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি।
আটলান্টিক কাউন্সিলের সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন প্যানিকফের মতে, নতুন করে সামরিক হামলা চালালেও ইরান তার অবস্থান থেকে সরে আসবে—এমন বিশ্বাসের কোনো শক্ত ভিত্তি নেই। বরং অতিরিক্ত চাপ দেশটির নেতৃত্বকে আরও কঠোর অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
হোয়াইট হাউস দাবি করছে, কূটনৈতিক সমাধানের পথ এখনো খোলা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ জোরদার করেছে এবং তেল রপ্তানিতে দেওয়া বিশেষ ছাড়ও বাতিল করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করছে। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা তার জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ইসরায়েলি গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচের মতে, সামরিক চাপ বাড়িয়ে ইরানের কট্টর নেতৃত্বকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব নয়। বরং হামলার মাত্রা বাড়লে পাল্টা প্রতিক্রিয়াও তীব্র হবে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, অতীতের ব্যর্থ কৌশল আবারও প্রয়োগ করলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা নয়, বরং নতুন করে অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকিই বাড়বে।
মন্তব্য করুন