রাজধানীতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে যাত্রীছাউনি নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল নির্ধারিত বাসস্টপে যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক অপেক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে বেশির ভাগ যাত্রীছাউনি এখন সেই উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারছে না।
কোথাও হকারের দখল, কোথাও ভবঘুরের আশ্রয়স্থল, কোথাও দোকান বা ময়লার স্তূপ। আবার অনেক যাত্রীছাউনিতে বাসই থামে না। ফলে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে সড়কে দাঁড়িয়ে বাসে ওঠানামা করছে।
গত কয়েক বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন রাজধানীতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন যাত্রীছাউনি নির্মাণ করেছে।
এসব যাত্রীছাউনির পরিকল্পনা করেছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। আর নির্ধারিত স্টপেজে বাস থামানো নিশ্চিত করার দায়িত্ব ট্রাফিক পুলিশের। তবে সমন্বয়ের অভাব, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং নজরদারির দুর্বলতায় যাত্রীছাউনিগুলোর বড় অংশ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
২২৯ স্থানের পরিকল্পনা, নির্মাণ হয়েছে ১০৪টি
ডিটিসিএর বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির নকশা ও ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর ২২৯টি স্থানে যাত্রীছাউনি নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ১৬৮টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৬১টি স্থান নির্ধারণ করা হয়।
এ পর্যন্ত ডিএনসিসি তিন কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬০টি যাত্রীছাউনি নির্মাণ করেছে। প্রতিটির নির্মাণ ব্যয় গড়ে প্রায় ১২ লাখ টাকা।
ডিএসসিসির অধীনে রয়েছে ৪৪টি যাত্রীছাউনি। আকারে তুলনামূলক ছোট এসব ছাউনি নির্মাণে প্রতিটির গড় ব্যয় প্রায় সাত লাখ টাকা।
এ ছাড়া ২০১৮ সালে বিমানবন্দর সড়কের দুই পাশে ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২টি দৃষ্টিনন্দন যাত্রীছাউনি নির্মাণ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ভিনাইল ওয়ার্ল্ড’।
হকার, দোকান, ময়লার স্তূপ
সরেজমিনে মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, গুলিস্তান, রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, দোলাইরপাড়, মহাখালী, বিমানবন্দর সড়ক, কুড়িল, মালিবাগ ও আজিমপুর এলাকায় যাত্রীছাউনির একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে।
অনেক যাত্রীছাউনির লোহার রেলিং খুলে নেওয়া হয়েছে, ভেঙে গেছে টেম্পার্ড গ্লাস, বেঞ্চ নেই। কোথাও ফল ও চায়ের দোকান, কোথাও ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। আবার অনেক যাত্রীছাউনি ভবঘুরেদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।
বছিলা এলাকায় একটি যাত্রীছাউনি প্রায় দুই বছর ধরে টেম্পোস্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সামনে রাখা হয়েছে ডিপিডিসির বড় আকারের কেবল রিল। ফলে ছাউনিটি প্রায় আড়াল হয়ে গেছে।
মোহাম্মদপুরের একটি যাত্রীছাউনির এক পাশে ডিএনসিসির ময়লার স্তূপ, অন্য পাশে মুদি ও সবজির দোকান। আল্লাহ করিম মসজিদের বিপরীত পাশের যাত্রীছাউনিও হকারদের দখলে।
ধানমণ্ডি-১৫, জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাব মোড়, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড ও মিরপুর সড়কের যাত্রীছাউনিগুলোর কোনোটিই কার্যকর বাসস্টপ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। শাহবাগ ও রমনা পার্ক এলাকার যাত্রীছাউনিতে আশ্রয় নিয়েছে ভ্রাম্যমাণ মানুষ।
আবার অনেক স্থানে যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে নিয়মিত বাস থামে না বা যাত্রী চলাচল কম। বিপরীতে মিরপুরের আনসার ক্যাম্প, মতিঝিল, রামপুরা, বাড্ডাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় যাত্রীছাউনি কম।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, যাত্রীছাউনির উদ্দেশ্য হলো যাত্রীদের রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং নির্ধারিত স্টপেজ থেকে ওঠানামার ব্যবস্থা করা। কিন্তু রাজধানীর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাস নির্ধারিত স্টপেজে না থামায় পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে।
একে অন্যকে দোষ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো
মোহাম্মদপুর-বিমানবন্দর সড়কে চলাচলকারী বাসচালক শহিদ মিয়া বলেন, যাত্রীরা বিভিন্ন স্থানে বাস থামাতে চাপ দেয়। আর যাত্রী তুলতে চালকরাও নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে বাস থামান।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর অভিযোগ, চালকরা ইচ্ছাকৃতভাবে বাসস্টপ এড়িয়ে চলেন। কিছু যাত্রী নিয়ম না মানলেও সেটি দেখার দায়িত্ব ট্রাফিক পুলিশের। যাত্রীছাউনি দখলমুক্ত রাখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশন, ডিটিসিএ ও পুলিশের। কিন্তু কোনো সংস্থাই কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করছে না।
অন্যদিকে নিজেদের দায়িত্বের কথা স্বীকার করলেও বাসস্টপ সচল না থাকার জন্য ট্রাফিক পুলিশের দিকেই আঙুল তুলছে দুই সিটি করপোরেশন।
ডিএনসিসির ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাঈম রায়হান খান বলেন, মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়, তবে নিয়মিত নয়। বাসস্টপে বাস না থামলে সেখানে দখল ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না।
ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং) রাজীব খাদেম বলেন, যাত্রীছাউনি নির্মাণ ও ট্রাফিক সাইন স্থাপনের কাজ করা হয়েছে। মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযানও পরিচালিত হয়। কিন্তু পরে আবার দখল হয়ে যায়।
তবে উত্তর সিটি করপোরেশন স্বীকার করেছে, নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে না। আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বলছে, বাজেটসংকটের কারণে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান বলেন, বাস রুট ব্যবস্থাপনা ও স্টপেজ ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় সমস্যা তৈরি হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক বাস পরিচালনাসহ বিভিন্ন কারণে এটি দ্রুত সমাধান করা যাচ্ছে না।
সমন্বয়ের দায়িত্ব ডিটিসিএর, সংকট জনবলে
ডিটিসিএ সূত্র জানায়, জনবল সীমিত হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি, সমন্বয় ও বাসস্টপ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে যাত্রীছাউনি নির্মিত হলেও সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, তিনি নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। রাজধানীর সব যাত্রীছাউনির অবস্থা পর্যালোচনা করে যাত্রীদের ব্যবহারের উপযোগী করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
মন্তব্য করুন