উচ্চ বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে নারী পাচারের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মানব পাচারকারী চক্রের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন কম বয়সী, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল নারীরা। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে রেস্টুরেন্ট, হাসপাতাল কিংবা পোশাক কারখানায় চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে গিয়ে অনেককে জোরপূর্বক যৌন শোষণ, ডান্স ক্লাব ও ম্যাসাজ পারলারে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পুলিশ, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও)-এর সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে নারী পাচারের এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। আইএলওর এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী পরিবারের নারী ও কিশোরীদের পাচারের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, পারিবারিক ঋণের চাপ এবং কর্মসংস্থানের সংকটকে পুঁজি করেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে মানব পাচারকারী চক্র। অনেক ক্ষেত্রে অসচ্ছল পরিবারের সদস্যদের আগাম অর্থ বা বিভিন্ন উপহার দিয়ে প্রভাবিত করে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
রাজধানীর কেরানীগঞ্জের ২৩ বছর বয়সী এক তরুণী (ছদ্মনাম আসমা) মাসে ৫০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির প্রলোভনে তিন বছর আগে দুবাই যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই তার পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় এবং একটি ডান্স ক্লাবে জোরপূর্বক কাজ করতে বাধ্য করা হয়।
দিন-রাত নির্যাতনের মধ্যে কাটানোর পর দেশে ফিরলেও প্রতিশ্রুত ১৮ লাখ টাকার পরিবর্তে তিনি পান মাত্র ২ লাখ টাকা। পরে বাকি টাকা ও পাসপোর্ট ফেরতের আশ্বাস দিয়ে আবার বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে এবং পাচারকারী চক্রের এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করে।
পাচারকারীদের টার্গেট থেকে বাদ যাচ্ছে না কিশোরীরাও। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্যে উঠে এসেছে, ১৩ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি কিশোরীকে বেড়ানোর কথা বলে ভারতে নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরে একাধিকবার হাতবদল হওয়ার পর গৃহকর্মীর আড়ালে ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার হয় সে।
পুলিশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ভারত, পাকিস্তান, লেবানন, জর্ডান, লিবিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশে কাজের প্রলোভনে নারী পাচারের ঘটনা ঘটছে। অনেককে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা হচ্ছে, আবার অনেক নারীকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে যৌন শোষণের অন্ধকার জগতে।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, বিদেশে কর্মসংস্থানের আড়ালে নারী পাচারের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো অনেক নারী বাধ্যতামূলক শ্রমে নিযুক্ত হচ্ছেন এবং ভারতে পাচার হওয়া নারীদের বড় একটি অংশ যৌন শোষণের শিকার হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, মানব পাচার মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষীর সংকট এবং স্থানীয় পর্যায়ে আপস-মীমাংসার কারণে অনেক মামলাই শেষ পর্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্র ভাঙতে সমন্বিত অভিযান, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশগামী নারী শ্রমিকদের বৈধ ওয়ার্ক পারমিট, নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার না হলে এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির লোভে অজানা দালালের মাধ্যমে যাওয়ার আগে সরকারি অনুমোদিত জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই হতে পারে নারী পাচার রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
মন্তব্য করুন