বাংলাদেশ পুলিশে একসময় নারীদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ ছিল প্রশাসনিক ও সহায়ক দায়িত্বে। তবে পাঁচ দশকের ব্যবধানে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই দক্ষতা, নেতৃত্ব ও পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর রেখে এগিয়ে যাচ্ছেন নারী পুলিশ সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি তদন্ত, অপারেশন, সাইবার অপরাধ দমন এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন তারা।
বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাহিনীতে ১৭ হাজার ৯৭০ জন নারী সদস্য কর্মরত রয়েছেন, যা মোট জনবলের ৯ দশমিক ০৭ শতাংশ। মহানগর ও জেলা পুলিশ, এপিবিএন, সিআইডি, পিবিআই, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌ পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, পুলিশ সদর দপ্তর এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ বিভিন্ন ইউনিটে তারা দায়িত্ব পালন করছেন।
শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক গাজী জসিম উদ্দিন বলেন, কঠোর পরিশ্রম, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে নারী সদস্যরা কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে অধিকাংশ শ্রমিক নারী হওয়ায় শ্রম অসন্তোষ নিরসনে নারী পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, নারী সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া শিল্পাঞ্চলে অনেক পরিস্থিতি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ত।
শিল্প পুলিশ ইউনিট-৩, চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম বলেন, নারী পুলিশ সদস্যদের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা তাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করে। তার মতে, উচ্চ পদে নারী কর্মকর্তাদের পদায়ন নতুন প্রজন্মের নারীদের পুলিশে যোগদানে উৎসাহিত করছে।
তিনি বলেন, ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল মামলায় ভুক্তভোগীরা নারী কর্মকর্তাদের কাছে নিজেদের অভিজ্ঞতা সহজে তুলে ধরতে পারেন। এতে তদন্ত কার্যক্রম আরও কার্যকর হয় এবং প্রমাণ সংগ্রহে সুবিধা হয়।
মাহমুদা বেগমের ভাষ্য, আগের তুলনায় বর্তমানে নারী পুলিশ সদস্যদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধা অনেক বেড়েছে। জ্যেষ্ঠ নারী কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনা নতুন সদস্যদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে এবং নেতৃত্বের উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।
তবে নারী কর্মকর্তাদের মতে, বাহিনীতে তাদের অংশগ্রহণ বাড়লেও নেতৃত্ব, অপরাধ তদন্ত এবং অপারেশনাল পুলিশিংয়ে সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
সম্প্রতি রাজধানীর রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক (বিপিডব্লিউএন)-এর ২০২৪-২০২৭ কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নবিষয়ক ঢাকা বিভাগীয় কর্মশালায় এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।
কর্মশালায় বিপিডব্লিউএনের সাধারণ সম্পাদক ও পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশিক্ষণ-২) মোছা. শাহালা পারভীন নারী নেতৃত্ব বিকাশ, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এছাড়া কর্মশালায় সাইবার অপরাধ তদন্ত, সাইবার নিরাপত্তা, কর্মস্থলের নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ইউএন উইমেনের প্রতিনিধিরা ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক পুলিশিং এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল তদন্ত পদ্ধতির ওপর প্রশিক্ষণ দেন।
বাংলাদেশ পুলিশে নারী সদস্য নিয়োগ শুরু হয় ১৯৭৪ সালে। সে সময় তাদের দায়িত্ব ছিল সীমিত। বর্তমানে তারা কনস্টেবল, এএসআই, এসআই, পরিদর্শক, এএসপি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পুলিশ সুপার, ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি এবং অতিরিক্ত আইজিপি পদে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বনারী ফর্মড পুলিশ ইউনিট মোতায়েনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী সদস্যদের সংখ্যা বৃদ্ধি, নেতৃত্বের সুযোগ সম্প্রসারণ, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং অপারেশনাল দায়িত্ব আরও বাড়ানো গেলে বাংলাদেশ পুলিশ আরও আধুনিক, দক্ষ ও জনবান্ধব বাহিনীতে পরিণত হবে। কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মন্তব্য করুন