ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) অফিসে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ঠিকাদারদের দাবি, সরকারি প্রকল্পের কাজ পেতে লটারিতে নির্বাচিত হলেও কার্যাদেশ, বিল অনুমোদন, জামানতের অর্থ উত্তোলনসহ প্রায় প্রতিটি ধাপেই গুনতে হয় অতিরিক্ত টাকা। অভিযোগ উঠেছে, বরাদ্দের নির্দিষ্ট শতাংশ কমিশন না দিলে ফাইল নড়াচড়া করে না।
সম্প্রতি উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেনের নামে ঘুষ আদায়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়েছে। ভিডিওতে হিসাব সহকারী কর্মকর্তা এনামুল হককে এক ঠিকাদারের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে দেখা যায়।
স্থানীয় ঠিকাদারদের ভাষ্য, ত্রিশাল এলজিইডি অফিসে ঘুষের সংস্কৃতি নতুন নয়। সাবেক উপজেলা প্রকৌশলী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ খন্দকারের বিরুদ্ধেও বরাদ্দের ২ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। এমনকি কমিশন না দিলে বিল আটকে রাখারও অভিযোগ ছিল। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাকে বদলি করা হয়।
তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেন প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও ঘুষের অভিযোগ থামেনি বলে দাবি ঠিকাদারদের।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, বর্তমানে ত্রিশালে নতুন স্কুল ভবন নির্মাণ, সড়ক উন্নয়ন, সংস্কার, এডিপি ও রাজস্ব খাতের ৩০টির বেশি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্পের বিল অনুমোদন, কার্যাদেশ ও অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বরাদ্দের ১ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দিতে হচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর বিলম্বিত করা হয়, এমনকি নানা অজুহাতে কাজও আটকে দেওয়া হয়।
সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক ঠিকাদার পাঁচ হাজার টাকা দিতে চাইলে হিসাব সহকারী এনামুল হক তা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, প্রকৌশলীর নির্দেশ অনুযায়ী এর চেয়ে বেশি অর্থ দিতে হবে, অন্যথায় ফাইল আটকে যাবে।
ভিডিওটি প্রকাশের পর ঠিকাদারদের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। তারা বলছেন, অফিসের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ঘুষ আদায় করা হচ্ছে।
এক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, মোক্ষপুর ইউনিয়নের একটি সড়ক সংস্কারকাজ চলাকালে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার পর পুনরায় কাজ শুরু করার অনুমতি দেওয়া হয়। কাজ শেষে বিল উত্তোলন এবং জামানতের টাকা ফেরত পেতেও অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আরেক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, উপজেলার বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে দুই লাখ টাকার বেশি ঘুষ দিতে হয়েছে। অন্যথায় বারবার ফাইল আটকে দেওয়া ও অযৌক্তিক আপত্তির মুখে পড়তে হয়েছে।
এলজিইডির ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী হুমায়ুন কবীর বলেন, বরাদ্দের বিপরীতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কোনো ধরনের কমিশন বা শতাংশ হারে অর্থ নেওয়ার বিধান নেই।
ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন বলেন, তিনি কোনো ঠিকাদারের কাছ থেকে অর্থ নেননি। হিসাব সহকারী এনামুল হকের ভিডিও প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভিডিওটি হাতে পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে হিসাব সহকারী এনামুল হক এ বিষয়ে ফোনে বিস্তারিত মন্তব্য না করে সরাসরি দেখা করে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, জুন ক্লোজিংয়ের সময় কয়েকজন ঠিকাদার মৌখিকভাবে ঘুষের অভিযোগ করেছেন। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
মন্তব্য করুন