ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব ও ইসরায়েল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ভিন্নধর্মী বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। সৌদি আরব যেখানে দ্রুত সংঘাত নিরসন ও কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে, সেখানে ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে।
বুধবার হোয়াইট হাউসে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বার্তা তুলে ধরেন।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত দ্রুত কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এর একদিন আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি, ওই বৈঠকে ইরানের ওপর আরও চাপ প্রয়োগ, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজন হলে সামরিক অভিযান পুনরায় জোরদারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
দুই মিত্র দেশের বিপরীতমুখী অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এর প্রভাবের মধ্যে চলে আসছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরুর সম্ভাবনা আপাতত খুবই সীমিত। যদিও ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, ইরান আলোচনায় আগ্রহ দেখাচ্ছে, তবে মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরে এ বিষয়ে সংশয় রয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত চাপ হিসেবে ব্যবহার এবং মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পদক্ষেপ থেকে ইরান সরে আসার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো দেয়নি।
সূত্রগুলোর মতে, ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। এ ছাড়া মিত্র দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গেও নিয়মিত আলোচনা চলছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার ক্যাম্প ডেভিডে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আমরা শুধু জিততে চাই। শেষ পর্যন্ত এই সংঘাত থেমে যাবে।”
এদিকে নিরাপত্তাজনিত কারণে সম্প্রতি ট্রাম্পের সফরসূচিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। তুরস্ক সফর শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সময় তার ব্যবহৃত উড়োজাহাজ পরিবর্তন করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
চলমান সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। আঞ্চলিক কয়েকটি দেশ স্বল্পমেয়াদি সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা লক্ষ্য করে সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনাও ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সতর্ক করে বলেছেন, কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে সব কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নাও হতে পারে।
অন্যদিকে রিপাবলিকান নেতারা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে কাতার, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ মধ্যস্থতার উদ্যোগ চালিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রধান ভূমিকা রাখছে। তবে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এখনো কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
মন্তব্য করুন