চাঁদপুরে মাদক যেন আর শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি এখন সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। জেলার শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম- সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে মাদকের বিস্তার। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে পরিবারে। মাদকের টাকার জন্য মায়ের ওপর সন্তানের নির্যাতন, সংসারে অশান্তি, চুরি-ছিনতাই, বিচ্ছিন্নতা ও পারিবারিক সহিংসতার মতো ঘটনা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, মামলা ও গ্রেপ্তার বাড়লেও থামছে না মাদকের কারবার। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, খুচরা বিক্রেতারা ধরা পড়লেও প্রভাবশালী গডফাদাররা থেকে যাচ্ছেন অধরাই।
জেলা পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরে বর্তমানে অন্তত ১৫টি এলাকা মাদকের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত। এসব এলাকায় সক্রিয় রয়েছে অন্তত ৩০ জন প্রভাবশালী মাদক কারবারী বা ‘গডফাদার’। তাদের অনেকেই এখনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাগালের বাইরে।
ফরিদগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম রূপসা গ্রামের এক বৃদ্ধা মায়ের জীবন যেন মাদকের কাছে বন্দি। নিজের ছেলের নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের শরণাপন্ন হয়েছেন।
তিনি জানান, টাকা না দিলে আমাকে মারধর করে। চুল ধরে টানে, ইট দিয়ে মেরেছে। হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছি। টাকা দিলে শান্ত থাকে, না দিলে মাথা গরম হয়ে যায়। টাকা দিতে হয়, আবার সে চুরি করলে সেই জরিমানাও দিতে হয়। এখন আমি কী করব?
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ এখন প্রায় নিয়মিতই আসছে।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুর সদর উপজেলার চান্দ্রা, হরিনা, বড় স্টেশন, করালিয়া কুলিবাগান, হাজীগঞ্জের টোরাগড়, মকিমাবাদ, রান্ধুনীমুড়া, বেলঘর, শাহরাস্তির ওয়ারুক, মতলব দক্ষিণের নারায়ণপুর, কচুয়ার কড়ইয়া, সাতবাড়িয়া ও সাচার, ফরিদগঞ্জের রূপসা এবং বাসটার্মিনাল এলাকা বর্তমানে মাদকের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল।
আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, এসব এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও বড় মাদক কারবারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। স্থানীয়ভাবে তাদের প্রভাব, নেটওয়ার্ক ও সাক্ষ্য সংকট এর অন্যতম কারণ।
হাজীগঞ্জ পৌরসভার টোরাগড় এলাকার বাসিন্দা মাঈনুদ্দিন জানান, মাদক এখন আমাদের এলাকায় মহামারির রূপ নিয়েছে। অলিগলি, রেললাইন- সব জায়গায় এর বিস্তার। পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। চুরি, ছিনতাই, জুয়া- সবকিছুর মূলেই এখন মাদক। আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
একই উপজেলার রান্ধুনীমুড়া এলাকার বাসিন্দা মানিক হাজী জানান, আগের তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু পুরোনো বিক্রেতারা সরে গেলে নতুনরা এসে জায়গা নিচ্ছে। রাতের আঁধারে এখনও মাদক বিক্রি হয়। প্রশাসনের আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
চাঁদপুর জজ আদালতের আইনজীবী শাওন জানান, মাদক মামলায় দেখা যায় একই ব্যক্তি বারবার গ্রেপ্তার হচ্ছে। যারা খুচরা বিক্রেতা তারাই বেশি ধরা পড়ে। কিন্তু বড় ডিলাররা ধরা পড়ে না। আবার অনেক মামলায় সাক্ষীরা সামাজিক ও বিভিন্ন চাপের কারণে আদালতে সঠিক সাক্ষ্য দিতে পারেন না। ফলে সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে অনেক আসামি খালাস পেয়ে যায়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে জেলায় ১ হাজার ৪০২টি অভিযান চালিয়ে ১৩০টি মামলা করা হয়। গ্রেপ্তার হন ১৪৯ জন। উদ্ধার করা হয় ১৫ হাজার ৫৮৭টি ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক এবং নগদ সাড়ে চার লাখ টাকা।
চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসেই অভিযান হয়েছে ৮০৬টি। মামলা হয়েছে ১১৪টি এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন ১২০ জন। অর্থাৎ বছরের অর্ধেক সময়েই মামলার সংখ্যা প্রায় আগের বছরের সমপর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
অন্যদিকে জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৮৪৬টি মাদক মামলায় ১ হাজার ১২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৭৪৫টি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৯৯৪ জন। এসব পরিসংখ্যান মাদকের বিস্তারের ভয়াবহতাই তুলে ধরছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, জেলা পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং জেলার আটটি থানা যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করছে। পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট ও বিশেষ ব্লক রেইড পরিচালনা করা হচ্ছে।
চাঁদপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিদর্শক মেহেদী হাসান রানা জানান, চাঁদপুরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬টি এলাকায় নিয়মিত অভিযান চলছে। কচুয়ার সাতবাড়িয়ায় বিশেষ ব্লক রেইড পরিচালনা করে দুটি গডফাদার পরিবারসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। টাস্কফোর্স মামলা ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। মাদকের কারণে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাও বাড়ছে। এসব অভিযোগ পেলেই আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি।
চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান জানান, মাদকের সমস্যা শুধু চাঁদপুরের নয়, সারাদেশের। এটি মোকাবিলায় আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। জেলা পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করেছে। আগে যেখানে মাসে প্রায় ১০০টি মামলা হতো, এখন তা প্রায় ২০০টিতে পৌঁছেছে। ডিলার ও মাদকসেবী- উভয়ের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, কোনো এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী সম্পর্কে তথ্য থাকলে পুলিশকে জানাতে হবে। তবে ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে কাউকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে অপপ্রচার চালানো থেকেও সবাইকে বিরত থাকতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অভিযান বাড়ালেই মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। বড় কারবারিদের আইনের আওতায় আনা, মামলার কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা, সাক্ষীদের নিরাপত্তা দেয়া এবং পরিবার ও সমাজকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তা না হলে চাঁদপুরে মাদকের ভয়াল থাবায় আরও বহু পরিবার ভেঙে পড়বে আর অসহায় বৃদ্ধা মায়ের মতো আর্তনাদ বাড়তেই থাকবে।
মন্তব্য করুন