মাত্র ১৫ বছরের চাকরিজীবনে বৈধ আয়ের তুলনায় বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মনিরুজ্জামান সরকারের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানভিত্তিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে তিনি এবং তার পরিবারের নামে ঢাকা, রংপুর ও কুড়িগ্রামে বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গাড়িসহ বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, মনিরুজ্জামান সরকার ২০১১ সালে ঠাকুরগাঁওয়ের বোদাগঞ্জ উপজেলায় অ্যাডহক ভিত্তিতে পিআইও হিসেবে চাকরি শুরু করেন। পরে স্থায়ী নিয়োগ পেয়ে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, সেখান থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার সূত্রপাত।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, প্রায় ৯০ লাখ টাকার বৈধ আয়ের বিপরীতে বর্তমানে তার নামে-বেনামে শতকোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর মিরপুরে একটি ফ্ল্যাট, রংপুরে একাধিক বাড়ি ও প্লট, কুড়িগ্রামে জমি, আবাসিক হোস্টেল, ফার্মেসি, একাধিক মাইক্রোবাস এবং ব্যক্তিগত বিলাসবহুল গাড়ির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া স্ত্রী আরফাতুন নাহারের নামেও জমি ও প্লট থাকার দাবি করা হয়েছে।
টিআর-কাবিখা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
অনুসন্ধানে আরও বলা হয়, দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দের অর্থ ব্যবহারে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়ারম্যানদের স্বাক্ষর নিয়ে পূর্ণ বরাদ্দ দেখানো হলেও প্রকল্পের অর্থের পুরোটা কাজে ব্যয় হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়ারম্যানদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বরাদ্দের তুলনায় অনেক কম অর্থ তাদের হাতে পৌঁছেছিল। এছাড়া কিছু প্রকল্পে কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগও উঠে এসেছে।
বদলি বাণিজ্য ও ব্যাংকে বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, তৎকালীন সময়ে প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবেও জমা রাখার অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুসন্ধান অনুযায়ী, এনআরবিসি ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংকে তার ও তার স্ত্রীর নামে হিসাব রয়েছে, যেখানে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র প্রকল্পেও প্রশ্ন
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালকের (এপিডি) দায়িত্ব পালনকালেও অনিয়ম ও আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
যা বললেন মনিরুজ্জামান
এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মনিরুজ্জামান সরকার বলেন, “আমার সম্পদসহ সব বিষয়ে আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করেছি। এ বিষয়ে নতুন করে কিছু বলতে চাই না।”
টিআইবির মতামত
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পরিচালক (আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, কোনো ব্যক্তির আয়ের সঙ্গে সম্পদের অসঙ্গতি দেখা গেলে তা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্ত করা উচিত। তদন্তে আয়ের সঙ্গে সম্পদের মিল না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সম্পদের উৎস ব্যাখ্যা করতে হবে।
তিনি বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন