
প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগ বেড়েছে রংপুরের মানুষের। বিদ্যুৎ না থাকায় বৈদ্যুতিক ফ্যান বন্ধ থাকছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ফলে গরম থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে অনেকেই আবার পুরোনো দিনের হাতপাখার দিকে ঝুঁকছেন। এতে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে হাতপাখার বিক্রি যেমন বেড়েছে, তেমনি কোনো কোনো ধরনের পাখার দামও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে রংপুর নগরীর কাচারীবাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, হাতপাখার দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। তালপাতা, বাঁশ, কাপড় ও প্লাস্টিকের তৈরি বিভিন্ন ধরনের হাতপাখা সাজিয়ে রেখেছেন বিক্রেতারা। আকার, নকশা ও মান অনুযায়ী এসব হাতপাখা বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত।
লোডশেডিংয়ে বেড়েছে বিক্রি
ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিবছর গরমের মৌসুমে হাতপাখার চাহিদা বাড়ে। তবে এবার তীব্র গরমের পাশাপাশি ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
কাচারীবাজারের হাতপাখা বিক্রেতা বাপ্পি মিয়া বলেন, গ্রামের কারিগরদের কাছ থেকে পাইকারি দামে হাতপাখা কিনে শহরে বিক্রি করেন তারা। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজারেও দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।
তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগেও যে হাতপাখার দাম তুলনামূলক কম ছিল, এখন কোনো কোনো পাখার দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
‘বিদ্যুৎ না থাকলে ঘরে থাকাই কঠিন’
হাতপাখা কিনতে আসা একরামুল হক বলেন, কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খুব খারাপ। দিন-রাত মিলিয়ে প্রায় ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। দিনে কোনোভাবে সময় কাটানো গেলেও রাতে ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ‘আধা ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই ঘণ্টাই থাকে না। বিদ্যুৎ না থাকলে ঘরে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে ১৪০ টাকা দিয়ে দুটি তালপাতার হাতপাখা কিনেছি।’
গৃহবধূ খাতিজা সুলতানার ভাষ্য, দিনে যেমন লোডশেডিং হচ্ছে, রাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে শিশুরা গরমে ঘেমে যায় এবং ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না।
সোলার বা আইপিএস কেনার সামর্থ্য না থাকায় হাতপাখাই তাদের পরিবারের ভরসা হয়ে উঠেছে। তিনি ৭০ টাকা করে দুটি হাতপাখা কিনেছেন বলে জানান।
দোকানপাটেও ভোগান্তি
মুদি দোকানি সাইফুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলেই দোকানের ভেতর দ্রুত গরম হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় সেখানে বসে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে ৮০ টাকা দিয়ে একটি হাতপাখা কিনেছেন তিনি।
জুম্মাপাড়া এলাকার বাসিন্দা তাজুল ইসলাম তাজ বলেন, প্রতিদিন কয়েকবার করে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর কয়েক ঘণ্টা আর পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে মানুষ হাতপাখা ব্যবহার করছেন।
শিক্ষার্থী নয়ন মিয়া বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনায়ও ব্যাঘাত ঘটছে। বিশেষ করে রাতে লোডশেডিং হলে পড়তে সমস্যা হয়।
শিশু ও নিম্নআয়ের মানুষের দুর্ভোগ বেশি
রংপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ না থাকলে বাসাবাড়ির পাশাপাশি দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র শিল্পেও ভোগান্তি বাড়ছে। দুপুর ও রাতের দিকে গরমের তীব্রতা বেশি অনুভূত হওয়ায় লোডশেডিংয়ের সময় পরিস্থিতি আরও অসহনীয় হয়ে উঠছে।
বিদ্যুৎ চলে গেলে ফ্যান বন্ধ হয়ে ঘরের ভেতর দ্রুত গরম হয়ে যায়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকের আইপিএস, ইউপিএস বা সোলার ব্যবস্থা করার সামর্থ্য না থাকায় হাতপাখাই এখন বিকল্প ভরসা।
বিশেষ করে শিশুদের দুর্ভোগ বেশি বলে জানিয়েছেন অভিভাবকেরা। রাতে বিদ্যুৎ না থাকলে শিশুরা ঘুমাতে পারে না, ঘামে বিছানা ও পোশাক ভিজে যায়। দরজা-জানালা খুলে দিয়েও অনেক সময় স্বস্তি মিলছে না। এর সঙ্গে মশার উপদ্রব বাড়ায় রাত কাটছে কষ্টে।
রংপুরে তাপমাত্রা ৩৪.১ ডিগ্রি
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান জানান, বুধবার রংপুরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৪ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগামী ১৫ আগস্ট পর্যন্ত গরমের প্রবণতা থাকতে পারে। তবে ১৬ আগস্ট বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম
রংপুর নেসকোর প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, রংপুরে বিদ্যুতের চাহিদা ৭০ থেকে ৭৫ মেগাওয়াট। কিন্তু বুধবার সরবরাহ পাওয়া গেছে প্রায় ৫০ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতির কারণে কিছুটা লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
তবে দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন তিনি।
এদিকে তীব্র গরম ও বিদ্যুতের ঘাটতির মধ্যে হাতপাখার বাড়তি চাহিদা যেন সাধারণ মানুষের দুর্ভোগেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নগরবাসীর অনেকের কাছেই পুরোনো এই হাতপাখাই হয়ে থাকছে গরম মোকাবিলার সহজ ও সাশ্রয়ী উপায়।
মন্তব্য করুন