স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুর রশিদ মিয়ার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগটি অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধানে অভিযোগের কিছু প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ একাধিকবার তলব করা হয়েছে। তবে পরপর তিন দফা নোটিশ দেওয়ার পরও তিনি দুদকে হাজির হননি এবং চাওয়া নথিপত্রও সরবরাহ করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সর্বশেষ গত ১৫ মে শেরেবাংলা নগর থানার মাধ্যমে তাকে চতুর্থ দফায় তলবি নোটিশ পাঠান দুদকের সহকারী পরিচালক মানসী বিশ্বাস। নোটিশটি আগারগাঁওয়ের এলজিইডি ভবন বরাবর পাঠানো হয়।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র দেওয়ার জন্য গত ১০ এপ্রিল, ১৬ এপ্রিল ও ২ মে তাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনো রেকর্ডপত্র সরবরাহ করেননি এবং নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হয়ে বক্তব্যও দেননি।
সর্বশেষ নোটিশে তাকে নিজের, স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের জাতীয় পরিচয়পত্র, স্মার্ট কার্ড, পাসপোর্ট ও জন্মনিবন্ধন সনদের ফটোকপিসহ হাজির হয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। দুদক আইন, ২০০৪-এর ১৯(৩) ধারার আওতায় রেকর্ডপত্র সরবরাহ না করলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আবদুর রশিদ মিয়াকে একাধিকবার তলব করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। দুদকের নিজস্ব অনুসন্ধানে অভিযোগের বিষয়ে কিছু তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই করতেই তাকে ডাকা হয়েছিল।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সর্বশেষ শেরেবাংলা নগর থানার মাধ্যমে তাকে তলবি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে অনুসন্ধানাধীন থাকায় এ পর্যায়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
যেসব সম্পদের অভিযোগ
দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, এলজিইডির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকালে আবদুর রশিদ মিয়া অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন। তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন ও ট্রেনিং), প্রকল্প পরিচালক এবং নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব পদে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে তিনি প্রায় ৩০০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন। এসব সম্পদের বড় একটি অংশ স্ত্রী, সন্তান ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের নামে করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রায় এক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বগুড়ার শেরপুর পৌরসভায় জমি, হিমছায়াপুরে বাগানবাড়ি, শাহবন্দেগী ইউনিয়নের খন্দকার তলা মৌজায় প্রায় ৫ একর জমি এবং শেরপুরের সেরময়া মৌজায় ১২ বিঘা জমি রয়েছে।
এ ছাড়া রাজশাহীতে পাঁচ ও সাততলা দুটি ভবন, একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল এলাকায় ২৫ শতাংশ জমির ওপর একটি ফুডগার্ডেন এবং সিরাজগঞ্জ-বগুড়া মহাসড়কে আরেকটি ফুডগার্ডেন থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। এসব সম্পদের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৭০ কোটি টাকা বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি এফডিআর এবং রাজধানীতে একাধিক বেনামি ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগও রয়েছে।
দুদকের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে দুদকের সহকারী পরিচালক মানসী বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দুদকের জনসংযোগ দপ্তরে যোগাযোগ করতে বলেন।
পরে দুদকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মোহাম্মদ শফিউল্লাহ বলেন, বিষয়টি বর্তমানে অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। তাই এ মুহূর্তে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আবদুর রশিদ মিয়ার বক্তব্য জানা যায়নি। দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও সম্পদের প্রকৃত মালিকানা সম্পর্কে চূড়ান্তভাবে কী তথ্য পাওয়া যায়, তা পরবর্তী কার্যক্রমেই স্পষ্ট হবে।
মন্তব্য করুন