বাংলাদেশে পথভিত্তিক নারী যৌনকর্মীদের অধিকাংশই স্বেচ্ছায় এ পেশায় আসেননি। বরং শৈশবের দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন, ঘরছাড়া জীবন এবং শারীরিক বা যৌন সহিংসতার মতো একাধিক সামাজিক ও পারিবারিক সংকট তাদের এই পেশায় ঠেলে দিয়েছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘কালচার অ্যান্ড সাইকোলজি’-তে প্রকাশিত ‘Beyond Redemption: Prevention, Protection and Narrative Identity Construction among Bangladeshi Street-Based Female Sex Workers’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য উঠে আসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইন্ডওয়েল রিসার্চ ল্যাব-এর অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম-এর নেতৃত্বে চার সদস্যের গবেষক দল গবেষণাটি পরিচালনা করেন।
গবেষণায় দেশের বিভিন্ন শহরের ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৩০ জন পথভিত্তিক নারী যৌনকর্মীর জীবনসংগ্রাম, অভিজ্ঞতা ও মানসিক অবস্থার বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৯৩ শতাংশ যৌন পেশায় যুক্ত হওয়ার আগেই গুরুতর যৌন বা শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এছাড়া ৬৭ শতাংশ অল্প বয়সেই নানা কারণে পরিবার ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
গবেষকদের মতে, এসব নারীর কাছে যৌন পেশা কোনো পছন্দের কর্মজীবন ছিল না। দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, নির্যাতন, নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম তাদের অনেককে শেষ পর্যন্ত এই পথে নিয়ে এসেছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া কয়েকজন নারী জানান, শৈশবে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও তারা কোনো সহায়তা পাননি। আবার কেউ কেউ কাজের সন্ধানে শহরে এসে প্রতারণার শিকার হয়ে জোরপূর্বক যৌন পেশায় জড়িয়ে পড়েন।
গবেষণার প্রধান গবেষক ড. মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, গবেষণায় অংশ নেওয়া ৩০ জন নারীর মধ্যে একজনও স্বেচ্ছায় এই পেশা বেছে নেননি। প্রায় সবার জীবনেই শৈশবের দারিদ্র্য, পারিবারিক অস্থিরতা, ঘরছাড়া জীবন এবং সহিংসতার অভিজ্ঞতা মিলেমিশে একই ধরনের বাস্তবতা তৈরি করেছে।
তার ভাষ্য, বিষয়টি কোনো ব্যক্তির চরিত্রগত সমস্যা নয়; বরং এটি একটি সামাজিক ও কাঠামোগত সংকট। তাই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কেবল পুনর্বাসন নয়, ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও নারীদের জন্য আগাম সুরক্ষা, দারিদ্র্য হ্রাস, পারিবারিক সহায়তা এবং সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
গবেষকদের মতে, সমস্যার উৎপত্তিস্থলে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জোরদার করা গেলে ভবিষ্যতে অনেক নারীকে এমন অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের মুখোমুখি হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
মন্তব্য করুন